শান্তিরবাজার: মাটির সঙ্গে তাঁদের আত্মার সম্পর্ক। সেই মাটিকে হাতের নিপুণ ছোঁয়ায় কখনও প্রদীপ, কখনও ধূপদানী, পাতিল, কলসি কিংবা পিঠার খোলায় রূপ দেন তাঁরা। বংশপরম্পরায় চলে আসা এই শিল্পই তাঁদের জীবিকা ও পারিবারিক পরিচয়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে উৎপাদন খরচ, শ্রমিকের মজুরি ও কাঁচামালের দাম। অন্যদিকে কমছে বিক্রির সুযোগ। ফলে দীপাবলির মতো বড় উৎসবের প্রাক্কালেও আর্থিক অনিশ্চয়তার অন্ধকার কাটছে না দক্ষিণ ত্রিপুরার শান্তিরবাজার মহকুমার বেতাগা পালপাড়ার মৃৎশিল্পীদের।একসময় মাটির তৈরি সামগ্রী ছিল মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। বর্তমানে বাজারে নানা ধরনের বিকল্প সামগ্রী চলে আসায় মাটির জিনিসের চাহিদা অনেকটাই কমেছে। তবুও নিজেদের ঐতিহ্য ধরে রাখতে নিরলস পরিশ্রম করে চলেছেন বেতাগা পালপাড়ার শিল্পীরা। মাটির পাতিল, ছোট-বড় ধূপদানী, প্রদীপ, পিঠার খোলা, কলসি-সহ বিভিন্ন সামগ্রী তৈরি করলেও উৎপাদনের খরচের তুলনায় উপার্জন যথেষ্ট কম বলে তাঁদের দাবি।শিল্পীদের কথায়, শুধু মাটি সংগ্রহ করলেই মাটির সামগ্রী তৈরি করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন নির্দিষ্ট মানের মাটি, খড় এবং অন্যান্য উপকরণ। সবকিছুই অর্থের বিনিময়ে সংগ্রহ করতে হয়। পাশাপাশি উৎপাদনের কাজে শ্রমিক নিয়োগ করতে হয়। দিন দিন শ্রমিকের মজুরি ও কাঁচামালের দাম বাড়লেও সেই অনুপাতে বাজারে তৈরি সামগ্রীর দাম পাওয়া যাচ্ছে না। পর্যাপ্ত পুঁজি না থাকায় অনেক সময় ঋণ নিয়ে কাজ চালাতে হচ্ছে তাঁদের। একদিকে পুরনো ঋণ পরিশোধের চিন্তা, অন্যদিকে নতুন করে পুঁজি সংগ্রহের চাপ—সব মিলিয়ে কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে দিন কাটছে শিল্পীদের।বেতাগা পালপাড়ার প্রবীণ মৃৎশিল্পী মীনা রুদ্রপালের জীবনেও এই আর্থিক সংকটের প্রভাব স্পষ্ট। পুত্রবধূকে সঙ্গে নিয়ে বাড়িতেই মাটির সামগ্রী তৈরির কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। দীর্ঘ প্রায় ২০ বছর ধরে এই পেশার সঙ্গে যুক্ত তাঁদের পরিবার। পুত্রবধূরও রয়েছে এই শিল্পে বিশেষ দক্ষতা। পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে পাওয়া ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে নিজেদের উদ্যোগে ঋণ নিয়ে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন তাঁরা। কিন্তু সরকারি সহায়তা না মেলায় আধুনিক যন্ত্রপাতি কেনা তাঁদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না।মৃৎশিল্পীদের দাবি, আধুনিক যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তির ব্যবস্থা করা হলে উৎপাদনের কাজ অনেক সহজ হবে। কম সময়ে বেশি সামগ্রী তৈরি করা সম্ভব হবে। এতে শ্রম কমার পাশাপাশি উৎপাদনের মানও উন্নত হবে। পাশাপাশি আর্থিক সহায়তা ও সরকারি সুযোগ-সুবিধা পেলে এই প্রাচীন শিল্পকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব বলে মনে করছেন তাঁরা।শিল্পীদের কাছে মাটির সামগ্রী তৈরি শুধু উপার্জনের মাধ্যম নয়, এটি তাঁদের পারিবারিক ঐতিহ্য ও আবেগের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে। সেই ঐতিহ্য পরবর্তী প্রজন্মের হাতে তুলে দেওয়ার ইচ্ছা থাকলেও আর্থিক নিরাপত্তার অভাবে ভবিষ্যৎ নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।দীপাবলির আগে চারদিকে যখন আলোর উৎসবের প্রস্তুতি চলছে, তখন বেতাগা পালপাড়ার মৃৎশিল্পীদের জীবনে যেন স্বস্তির আলো অধরাই রয়ে গেছে। তাঁদের প্রশ্ন, প্রয়োজনীয় সরকারি সহায়তা ও আধুনিক পরিকাঠামো কবে মিলবে? সময়মতো উদ্যোগ না নেওয়া হলে বংশপরম্পরায় চলে আসা এই প্রাচীন মৃৎশিল্প একদিন হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
দীপাবলির আগেও অন্ধকারে বেতাগা পালপাড়া! আর্থিক সংকটে ধুঁকছেন মৃৎশিল্পীরা
